August 18, 2019
  • ডেঙ্গু প্রতিরোধে সেনানিবাসে পরিচ্ছন্নতা অভিযান
  • ভার‌তের সা‌বেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মারা গে‌ছেন
  • সুষমা স্বরাজের মৃত্যুতে শেখ হাসিনার গভীর শোক
  • ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২০ মামলার আসামিসহ নিহত ২
  • বিনিয়োগকারী ও গণ মাধ্যমকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহবান
  • যুক্তরাষ্ট্রে গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নিন্দা
  • সম্প্রচার খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ চলছে: তথ্যমন্ত্রী
  • ফখরুলসহ বিএনপির চার নেতাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ
  • ফটোসেশন করলে হবে না, কাজ করুন: ওবায়দুল কাদের
  • মশা মারতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু

স্বৈরশাসক থেকে পল্লীবন্ধু এরশাদ : ১৯৩০-২০১৯

ershad222
বাংলার নিউজ ডট কমঃ না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। বাবা-মা আদর করে ডাকতেন পেয়ারা নামে। নয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

জন্ম নেন ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত ভারতের কুচবিহারে। পরে তার পরিবার রংপুরে চলে আসে। স্কুল এবং কলেজ জীবন কেটেছে রংপুর শহরে। বাবা মকবুল হোসেন। মা মজিদা খাতুন। জীবনের শেষ বয়সে এসে রাজনীতিতে তিনি জন্ম দেন নানা আলোচনা-সমালোচনার।

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৪৬ সালে দিনহাটা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করেন। পরে ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। সেখানে পড়ার সময় মনোযোগ দেন লেখালেখির দিকে। ছিলেন কলেজ ছাত্রসংসদের সাহিত্য সম্পাদক।

নামকরা আইনজীবী বাবার মতো হতেই এরশাদের ইচ্ছা ছিল। ১৯৫০ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকায় পা রাখেন তিনি। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাত্র ২০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন এরশাদ।

এর আগে ১৯৪৮ সালে কারমাইকেল কলেজের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এরশাদ। বিশ্ববিদ্যালয়েরও ক্রীড়া দলের তিনি ছিলেন কৃতী খেলোয়াড়। ১৯৫৩ থেকে ৫৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা অঞ্চলের ফুটবল দলের অধিনায়কও ছিলেন তিনি।

সেনাবাহিনীতে এরশাদ

১৯৫২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। এরপর ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ। সেখানেও অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদন্নতি পান।

সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এরশাদ প্রথম নিয়োগ পান ২ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের কোয়েটে স্টাফ কলেজ থেকে স্টাফ কোর্স সমাপ্ত করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের ডেপুটি অ্যাসিসটেন্ট অ্যাডজুট্যান্ট ও কোয়াটার মাস্টার জেনারেল ব্রিগেড মেজর ছিলেন।

পাকিস্তানে বন্দি থাকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি এরশাদ। ১৯৭৩ সালে ১২ ডিসেম্বর কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সরকার উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের দিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে পাঠায়। সেখানেই প্রশিক্ষণকালে তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হন। ওই বছর আগস্ট মাসে আবার পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হন।

১৯৭৮ সালের ১ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৯ সালের ৭ নভেম্বর তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৮০ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সেনা বিদ্রোহ দমন করেন এরশাদ।

১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ দেশে সামরিক আইন জারি হয়। শাসনকাজ হাতে নেন এরশাদ। এরপর ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠন করেন জাতীয় পার্টি। একটানা ৯ বছর শাসন করেন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণ-আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।

১৯৯১ সালে গ্রেফতার হন। ছয় বছর কারান্তরীণ থাকার পর ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে জামিনে মুক্ত হন এরশাদ। জেলে থাকা অবস্থায় দুটি সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুবারই পাঁচটি করে আসনে জয় পান। তবে আদালতের রায়ে দণ্ডিত থাকায় বাতিল হয় তার সংসদ সদস্য পদ।

এদিকে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সামনে আসে জাতীয় পার্টি। তবে এরশাদ হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। তার স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে দায়িত্ব পালন করেন।

সবশেষ ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও সংসদে বিরোধী দলে জায়গা পায় জাতীয় পার্টি। এরশাদ হন বিরোধীদলীয় নেতা।

২০১৯ এর ১৪ জুলাই, রোববার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্বৈরশাসক থেকে পল্লীবন্ধু

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষির অবস্থা ছিল নাজুক। ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এরশাদ ছুটে যান কৃষকের ঘরে ঘরে। তাদের সার-বীজ-কীটনাশকের ব্যবস্থা করে দেন। কালোবাজারিদের জন্য কঠোর হলেন। কৃষকের সমস্যা বুঝতে শুরু কররেন। নিলেন নানা পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন পল্লীর গণমানুষের বন্ধু।

১৯৮৪ সালে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন তিনি। উপজেলা পরিষদসমূহের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের মে মাসে।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্যে ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে আয়োজিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদকালের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এর আগে কারচুপির মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়ে এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৃতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন আহ্বান করেন। সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী আইন পাস করে সেদিন জাতীয় সংসদ সংবিধান পুনর্বহাল করে। এর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখলসহ সামরিক আইন ও বিধিবিধান দ্বারা সম্পাদিত সব কাজ ও পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়া হয়।

তবে বিরোধী দলের প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। প্রধান বিরোধী দলগুলো ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনও বর্জন করে। এরশাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর অবিরাম আন্দোলন চলতে থাকে এবং প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

মূলত থানাপর্যায়ে দেশব্যাপী উপজেলা স্থানীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্যই এরশাদ আমল (১৯৮২-৯০) স্মরণীয় হয়ে আছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশি কেন্দ্র হিসেবে থানা সৃষ্টি করে।

ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের জন্য ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো থানা পর্যায়ে একটি স্থানীয় সরকার ইউনিট গঠন করা হয়। প্রেসিডেন্ট এরশাদ স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যকরভাবে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রশাসন ও পরিকল্পনায় তাদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উপজেলা পরিষদ পুনর্গঠন

একটি আইনি কাঠামো দাঁড় করাতে ১৯৮২ সালে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ধাপে ৪৬০টি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।

এ আইনের আওতায় উপজেলা পরিষদগুলোকে একটি কর্পোরেট সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হয়, যাতে প্রতিনিধিত্বমূলক সদস্য ছাড়াও পেশাজীবী ও প্রায়োগিক কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত হন।

চেয়ারম্যানরা ছিলেন পরিষদের প্রধান নির্বাহী এবং তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। এর বাইরে উপজেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সভাপতি, তিনজন মহিলা সদস্য, একজন মনোনীত সদস্য এবং সরকারি সদস্য। উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা ১৯৮৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সার্ক গঠনে সাফল্য

দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেয়া ছিল এরশাদের আরেকটি বড় সাফল্য ছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশের সাতটি রাষ্ট্র যার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ১৯৭৯ সাল থেকে চার বছরের প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষে ১৯৮৩ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কর্মসূচি চালু করা হয়।

এর দুই বছর পর ১৯৮৫ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমন্ত্রণে এ অঞ্চলের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা ঢাকায় একটি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। ওই প্রথম শীর্ষ সম্মেলনেই দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা সার্ক গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যাতে অন্তর্ভুক্ত হয় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ।

প্রেসিডেন্ট এরশাদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং দেশে ব্যক্তি খাতের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সরকারি মালিকানাধীন উত্তরা, পূবালী ও রূপালী ব্যাংকের বিরাষ্ট্রীয়করণ। এ সময় দেশে প্রথমবারের মতো বেশ কয়েকটি বেসরকারি বাণ্যিজ্যিক ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিকে কার্যক্রম শুরুর অনুমতি প্রদান করা হয়

দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও সংস্কারেও এরশাদ সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নেয়। মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করার মাধ্যমে দেশে জেলার সংখ্যা ৬৪ করা হয়। এগুলোর অধীনে আবার ন্যস্ত করা হয় ৪৬০টি উপজেলাকে।

নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক স্বার্থ সমুন্নত রাখতে এরশাদ সরকার ১৯৮৪ সালে একটি পৃথক মহিলাবিষয়ক অধিদফতর স্থাপন করে।

এরশাদ আমলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল পুলিশসহ বিভিন্ন সিভিল পদে মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যক সেনা কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ। তবে প্রশাসনের আকার কমাতে তিনি বেশকিছু অপ্রয়োজনীয় দফতর বিলোপ করেন এবং অনেক দফতর একীভূত করেন।

জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করে আর বিশ্ব ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ দাতাদের কাছ থেকে তহবিল জোগাড়ের লক্ষ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে এরশাদই প্রথম যমুনা সেতু নির্মাণের বাস্তব পদক্ষেপ নেন।

তার অন্যান্য সৃজনশীল প্রয়াসের মধ্যে ছিল পথশিশুদের প্রয়োজন মেটাতে ‘পথকলি ট্রাস্ট’ গঠন এবং দেশের পরিবেশবিষয়ক একটি সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন।

বিশেষ করে উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার কারণে এরশাদের অনুসারীরা তাকে ‘পল্লীবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করেন।

বিভাগ - : রাজনীতি

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য দিন